নবজাতকের জীবন বাঁচাতে NICU: কখন প্রয়োজন হয়, কী লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন, জানালেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অঙ্কিত গোয়েল
ডেস্ক রিপোর্ট: নবজাতকের প্রথম কয়েকটা দিন—সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। সামান্য শ্বাসকষ্ট, দুধ না খাওয়া, বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব—এগুলো অনেক সময় বড় সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে NICU
(Neonatal Intensive Care Unit)–এ বিশেষ পর্যবেক্ষণ শুরু হলে শিশুকে জটিলতা থেকে বাঁচানো অনেক সহজ হয়।
NICU কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
NICU হলো হাসপাতালের একটি বিশেষ ইউনিট যেখানে জন্মের পর প্রথম ২৮ দিনের শিশুদের জন্য ২৪ ঘণ্টা উন্নত মনিটরিং ও চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখানে শিশুর অক্সিজেন লেভেল, শ্বাস-প্রশ্বাস, হার্টবিট, তাপমাত্রা, সংক্রমণের ঝুঁকি—সবকিছু নিয়মিত দেখা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, NICU-র মূল লক্ষ্য হলো দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করে শিশুকে স্থিতিশীল করা, যাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এড়ানো যায়।
কোন কোন কারণে শিশুকে NICU-তে নিতে হতে পারে?
হাসপাতাল সূত্রে জানা যাচ্ছে, কিছু সাধারণ কারণ হলো—
- অকাল জন্ম (Premature) বা কম ওজন
- জন্মের পর শ্বাস নিতে দেরি/ শ্বাসকষ্ট
- ফুসফুস অপরিণত থাকায় শ্বাসের সমস্যা
- ইনফেকশন/সেপসিস
- অতিরিক্ত জন্ডিস (ফোটোথেরাপি দরকার হতে পারে)
- রক্তে শর্করা কমে যাওয়া (Low sugar)
- খিঁচুনি বা স্নায়বিক সমস্যা
- জন্মের সময় মেকোনিয়াম (নোংরা পানি) শ্বাসে ঢুকে যাওয়া
কী লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি?
চিকিৎসকদের পরামর্শ—নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনোটি দেখা গেলে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে যেতে হবে:
- খুব দ্রুত শ্বাস, বুক দেবে যাওয়া, নাকে ফুলে শ্বাস
- ঠোঁট/ত্বক নীলচে হয়ে যাওয়া
- দুধ না খাওয়া, খুব দুর্বল লাগা বা অতিরিক্ত ঘুম
- জ্বর বা শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা
- খিঁচুনি
- চোখ-ত্বক খুব হলুদ হয়ে যাওয়া
- প্রস্রাব কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক কান্না
আগে ধরতে পারলে কী লাভ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু হলে—
- সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
- অক্সিজেনের ঘাটতি কমিয়ে মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রক্ষা করা যায়
- জন্ডিস/লো সুগার/শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দ্রুত স্থিতিশীল করা যায়
ফলে শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতে স্বাভাবিক বিকাশ—দুটোই বাড়ে।
আধুনিক চিকিৎসা কীভাবে সাহায্য করছে?
আজকের NICU-তে রয়েছে ইনকিউবেটর/ওয়ার্মার, ফোটোথেরাপি, অ্যান্টিবায়োটিক, IV ফ্লুইড, CPAP বা ভেন্টিলেটর, সার্ফ্যাক্ট্যান্ট থেরাপি এবং উন্নত মনিটরিং। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, সময়মতো সঠিক কেয়ার পেলে অনেক নবজাতক কয়েক দিনের মধ্যেই স্থিতিশীল হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।
এদিকে অনেকে “ইনহেলার” শব্দটি শুনে বিভ্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনহেলার সাধারণত বড় শিশুদের হাঁপানি/শ্বাসনালির সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। নবজাতকের ক্ষেত্রে NICU-তে মূলত অক্সিজেন সাপোর্ট ও আধুনিক শ্বাস-সহায়তা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। পরে শিশুর বয়স ও রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করেন চিকিৎসক।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন—
- শিশুর চারপাশ পরিষ্কার রাখুন, হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক
- ভিড় এড়িয়ে চলুন, ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করুন
- চিকিৎসকের নির্দেশে ব্রেস্টফিডিং/ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার করুন
- সময়মতো ফলো-আপ ও টিকা নিশ্চিত করুন
বিশেষজ্ঞের বার্তা
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অঙ্কিত গোয়েল বলেন, “NICU
মানে ভয় নয়—এটা নবজাতকের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জায়গা। শিশুর শ্বাস, খাওয়া, ত্বকের রঙ বা আচরণে সামান্য পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—সময়টাই এখানে সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।”